ভালোবাসার গল্প ।। শারমিন শামস্‌

1334

এই শহরে আমার একটা ভালোবাসার রাস্তা আছে। এই দমবন্ধ শহরেও এমন এই রাস্তা, যাকে ভালোবেসে আমি অন্য নামে ডাকি। আর এ যাবৎকালে যারা আমার প্রেমিক হয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই আমি আহ্বান করেছিলাম এই রাস্তা ধরে হেঁটে যাবার। বলা বাহুল্য, তারা কেউই আমার সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। যাই হোক, দূর থেকে রাস্তার প্রতি প্রেমময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। যাওয়া-আসার পথে ওই রাস্তাটার দিকে সকরুণ দৃষ্টি দিতে দিতে আমি সব সময় ভাবতাম, একদিন ঠিক এই রাস্তাটা ধরে বহু দূর হেঁটে যাব। আমার ধারণা ছিল, এই রাস্তা অনন্তকালের পথ ধরে চলে গেছে এবং কোথাও থামেনি। ওই রাস্তা দিয়ে চলার শান্তিটুকুই আমার চাওয়ার ছিল, যাবার ছিল না কোথাও।

তো, এক সকালে একজন আমাকে বললেন, তার বড় ইচ্ছে আমাকে নিয়ে সমুদ্র দেখবেন। সমুদ্র দেখা চাট্টিখানি কথা নয়। ইটকাঠের শহর ছেড়ে পাড়ি জমানো আরও দুরূহ। আমি তার কথা হেসেই উড়িয়ে দিয়ে বললাম, সমুদ্র না, তার চেয়ে চলো যাই সেই রাস্তাটা দেখে আসি। সে চোখ কুঁচকে বললো, কোন রাস্তা? আমি তখন গভীর ভালোবাসা নিয়ে সেই রাস্তার রূপ বর্ণনা করলাম। ঘন কালো পাতায় ছাওয়া সে এক রাস্তা আছে। নগরের ভেতরে থেকেও সে নাগরিক নয়। আবার ঠিক গ্রামীণও নয়। এত সপ্রতিভ তার উপস্থিতি। তবু এত নিরিবিলি, নিশ্চুপ, ধ্যানস্থ! সমুদ্রপ্রেমী সেই মানুষ বড় বিরক্ত হলো। তার বুকের ভেতরে তখন সমুদ্র গজরাচ্ছে, ডাকছে। তাকে যেতেই হবে। তার বড় সাধ, সমুদ্রের হাওয়ার ভেতর দিয়ে তীর ধরে হেঁটে যাওয়া; সঙ্গে যেন থাকি আমি। আমার তখন উনিশ-কুড়ি। আমি তখন রঙের ভেতর দিয়ে সাঁতরে সাঁতরে কোথায় যেন চলে যাই ঘুমের ভেতরে! একটা মায়াঝরা প্রবল বাতাসওয়ালা সন্ধ্যায় আমি তাকে কথা দিলাম- বেশ, সমুদ্রে যাব এবার।

তো চললাম সমুদ্রে। সদরঘাট পেরিয়ে দূরপাল্লার বাস যখন সবুজ সবুজ গ্রামগঞ্জ পেরোচ্ছে, তখন মাথায় ঢুকলো- এ কোথায় চললাম আমি? বাইরে শাঁ শাঁ ছুটে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত, খড়ের গাদা, ন্যাংটো শিশু, ক্লান্ত কৃষক। আর আমি আমার মনের ভেতরে আরও একটা মন, তার ভেতরে আরো আরো কয়েকটা মনের অলিতে গলিতে ঢুকে ঢুকে হাতড়াচ্ছি প্রশ্নের উত্তর- কেন চললাম? কোথায় চললাম? সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে যখন বাসের জানালায় সমুদ্রের হাওয়ার ঝাঁপটা এসে লাগলো, আমরা বুঝলাম, আমি আমার এলোমেলো অন্তরাত্মা আর খেয়ালি মনটা নিয়ে চলে এসেছি সমুদ্রের শহরে। এর থেকে আপাতত ফিরে যাবার পথ নেই। ওদিকে অসহিষুষ্ণ সাগরের হাঁউমাউ ক্রমাগত কানে বাজছে। তাই খুব তাড়াহুড়ো করে ধবধবে স্কার্ট দুলিয়ে একটা সাদা রাজহাঁসের মতো আমি এসে দাঁড়ালাম সমুদ্রের সামনে। হাওয়ার ভেতরে সাদা স্কার্টের প্রান্ত উড়ছিল। আর আমি প্রবল বাতাসের দাপটে বারবার কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। সেই প্রথম আমার সমুদ্র দেখা। বালির ওপরে বসে আমি সেই কখনো রাগী, কখনো অস্থির আবার কখনো নির্বিকার জলরাশির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, হুট করে সমুদ্রে আসতে নেই। ওদিকে আমার সঙ্গে তীর ধরে হেঁটে যাবে বলে সে মানুষটি কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রের সামনে। সে তখন বাদামওয়ালা ডেকে দু’টাকার বাদাম, এক বোতল পানি কিনেছে। আর মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে আমাকে। বহুকাল পরে জেনেছি, সেই সন্ধ্যা নামার আগে আগে, উন্মাতাল সমুদ্র গর্জনের সামনে, বালির আসনে বসে দূর থেকে আমাকে তার ক্লিওপেট্রার মতো রহস্যময় আর নিষ্ঠুর মনে হচ্ছিল। যাই হোক, তার মনের ভাষা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না। আর সেই ভাষা বোঝার অক্ষমতার দায়েই আমরা তৎক্ষণাৎ সমুদ্রসম্মুখ থেকে ফিরে এলাম এবং ফিরে গেলাম। যাবার পথটি যতটা রোমাঞ্চে ভরপুর ছিল, ফিরে যাবার পথটা হলো ততটাই বেদনাবিধুর। আমরা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছিলাম না, তবু এক দীর্ঘ পথ আমাদের পাশাপাশি আসনে গায়ে গা লাগিয়ে বসে ফিরতে হচ্ছে, এবং আমরা জানি এরপর ‘দু’জনার দুটি পথ’ একেবারে বিপরীতে যাবে মিশে।

ইটকাঠের শহরে আমরা মিশে গিয়েছিলাম। এরপর আর কখনো সেই সমুদ্রনেশাগ্রস্ত মানুষটির সাথে আমার দেখা হয়নি। আমার বয়স বাড়ছিল, আর আমি ক্রমশ নিজেকে ভালোবাসতে শিখছিলাম। বরাবরের মতো কাজে যাওয়া-আসার পথে সেই রাস্তাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাকেই পেরিয়ে চলে যাওয়ার একটা অভ্যাস হয়ে উঠেছিল। আর প্রত্যেকবার ভাবতাম, একদিন ঠিক ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াবো, ওর শরীরে জমে থাকা শুকনো ডালপালা, পাখির পালক কুড়াতে কুড়াতে হেঁটে যাব যদ্দুর যাওয়া যায়। কিন্তু যে নগরে আমার বাস, সেটি শাসন করেন যে বিশালকায় দৈত্য, তার নিঃশ্বাসের বিষে পুড়তে পুড়তে আমরা এতই ক্লান্ত হই দিন-শেষে যে; এতটা ভালোবেসেও আর এতটা মোহগ্রস্ত হবার পরও ওই রাস্তাটির মুখোমুখি হওয়া হয় না আমার। তবু বুকের ভেতরে এই স্বপ্নটা রয়েই যায়। একটা প্রজাপতি ওড়া বিকেলে কিংবা মেঘডাকা বোশেখ মাসে আমি ঠিক ওইখানে যাব। যাওয়া হয় না।

পরিণত বয়সে আমি যার সঙ্গে একত্র বাসের সিদ্ধান্ত নিলাম, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের বয়স তখন তিন মাস। আমরা একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে এক সাথে থাকা শুরু করলাম। আর এ রকম একটা ঘোষণা পরস্পরকে দিলাম_ এক সাথে থাকলেও আমরা যে কোনো মুহূর্তে আলাদা হয়ে যাবার সম্ভাবনা ও স্বাধীনতার মধ্যে আছি। আমি তখন একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করি। আমার প্রেমিক ও রুমমেট; সে ছবি আঁকে। অ্যাপার্টমেন্টের একটি ঘরে তার স্টুডিও। দিন-রাত একাকার করে সে কাজ করে। তিন মাসের প্রেম আর দেড় মাস একত্রে থাকার সেই তুখোড় সময়ে আমার তার কর্মকাণ্ড সবকিছুই অভিনব আর অসহ্য সুন্দর লাগে। একটা আবেগঘন মুহূর্তে আমি আমার সেই চিত্রকর প্রেমিককে বললাম, আমার একটা রাস্তা আছে। পাতাঝরা আর বিষণ্ন সুন্দর। চলো ওর কাছে যাই। সে আমার চোখে চুমু খেয়ে কথা দিল, একদিন দু’জনে মিলে ঠিক যাওয়া যাবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে উড়ে যাওয়া মেঘ আর প্রজাপতির ছবি আঁকবার পরিকল্পনাও হলো।

আমি সাতসকালে অফিসে বেরিয়ে যাই, ফিরি সন্ধ্যায়। এসে রাতের খাবার বানাই। কোন কোন রাতে আমরা আমাদের সস্তা স্টেশন ওয়াগনটা চালিয়ে চলে যাই দূরে। কিংবা কোনো বন্ধুর বাড়ি। কখনো কখনো আড্ডা গল্পে রাতভোর হয়ে যায়। আমার মনে হতে থাকে, জীবন সুন্দর। চিত্রকর মানুষটা আমার ছবি আঁকে। খুব গর্বিত ভঙ্গিতে আমি বসে থাকি ইজেলের সামনে। রাস্তার কথা ভুলে যাই। মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার পথে ওই রাস্তার দিকে ফিরেও তাকাই না। হঠাৎ কখনো চোখ পড়লে দেখি হলুদ হলুদ পাতায় এলোমেলো পড়ে আছে রাস্তা। আমার মনে পড়ে, শীত আসছে। বাড়ি ফিরে আমি শীতের কম্বল আর যা কিছু দরকারি সেগুলো কেনার লিস্ট তৈরি করি। ধীরে ধীরে দুই বেডরুমের ওই অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে আমার নিজের একটা সংসারের স্বপ্ন কিলবিলিয়ে বাড়তে থাকে। অথচ আমি নিজেই তা টের পাই না।

সংসারের স্বপ্ন পয়সাকড়ি ছাড়া বেল পায় না। আর স্বপ্ন আমি একাই দেখি। তাই দুই হাতে সেই স্বপ্ন আমিই সামলে রাখি। আর্টিস্ট ছবি আঁকে। একদিন কোন এক লাগামহীন মুহূর্তে আমি তাকে বলে ফেলি, আমার খুব ইচ্ছে সংসারের। সে প্রায় আঁৎকে ওঠে। আমি তাকে অভয় দিই, সংসারের জন্য তার ছবি আঁকায় কোনো ব্যাঘাত হবে না। তাও সে মুখ ভার করে রাখে। আমি তখন ইনিয়ে বিনিয়ে তাকে জানাই, সংসার খরচের সব দায়িত্ব আমার। এবার তার চোখমুখে হালকা ঝলমলে ভাব দেখা যায়। দিন সাতেক পর আমরা বিয়ে করি।

বিয়ের পরমুহূর্ত থেকেই সব কিছু অন্যরকম লাগতে থাকে। কেমন এক নতুন ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাই। ছোট্ট বাসাটা সাজাতে ইচ্ছে করে। নতুন নতুন জিনিস রাঁধতে ইচ্ছে করে। সবই একা হাতে করি। নতুন সংসারের ঘোরটা আমার একার। তাই একাই সেই ঘোরের জগতে পাক খেতে থাকি। এদিকে জিনিসের দাম বাড়তে থাকে। আমি বড্ড চিন্তায় পড়ে যাই। আগে খরচ ছিল একার। বিয়ে করামাত্র আমার স্বামী তার ভারটাও ছেড়ে দিয়েছেন আমার ওপর। আমি দু’জনের ভার টানতে টানতে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠি। সেই ক্লান্তির কথা তাকে বলতেও পারি না। বিয়ে করেছি নিজের ইচ্ছেতে, নিজেই দায়িত্ব নিয়েছি। এখন সামলাও। বড্ড খারাপ লাগে কখনো কখনো। বছর ঘুরে বিয়েবার্ষিকী আসে। আমার স্বামী একটা কাঠি লজেন্স নিয়ে ঘরে ঢোকে। আমরা হাসি। আমার শরীর ভালো নেই। জন্ডিস হয়েছে। আমার খুব ইচ্ছে করে কারো যত্নআত্তি পেতে। আমার চিত্রকর স্বামীর মাথায় এইসব আসে না। কিন্তু আমারও ইচ্ছে বাড়তে থাকে। সেই কবে, কোন এক অলক্ষুণে মুহূর্তে আমি নিজেকে ভালোবাসতে শিখেছি। ভালোবাসা চাইতে, আদায় করতে শিখেছি। আমি সেই মতো তার কাছে বলি, একটু হাত রাখো মাথায়। দুটো ডাব বা কলা বা দুটো আপেল, এনে তো দিতেই পারো। আর্টিস্ট বড্ড মন খারাপ করে। এই সব অশিল্পিত চাহিদা তাকে মর্মাহত করে। একদিন এক কাকডাকা ভোরে দেখি সে তার বাক্সপেটরা গুছিয়ে তৈরি। আমি প্রেমিকা থেকে বৌ হয়ে উঠেছি বলেই তার শিল্পীমন আমাকে আর গ্রহণ করতে পারছে না। তাই সে বিদায় নিচ্ছে। আমি বড্ড ভড়কে যাই। তাকে আটকাবার চেষ্টাও করি। সে অনড়। পাশের দেশ থেকে তার ডাক এসেছে। সে পড়তে চলে যাবে ক’দিন বাদেই। আমাকে জানাবার ইচ্ছেও নাকি হয়নি তার। এইবার আমি চুপ হয়ে যাই। লোকটাকে গেট পর্যন্ত বিদায় জানাই। ভালো থেকো আর সাবধানে যেও- এইসবও বলি। সে চোখ ঘুরিয়ে একটু অবাক চোখে তাকায়। তবে চলে যায়।

ছোট্ট বাসাটায় আমি এঘর-ওঘর ঘুরি। মন খারাপ হবার কথা। মন খারাপ লাগে। শূন্যতার বোধ তৈরি হয়। আমি বেরিয়ে যাই ওই বাসা থেকে। একবার ভাবি, দূরে চলে যাই। একবার ভাবি, চলে যাই শৈশবের শহরে। একবার মনে হয়, নদীর ঘাটে বসে থাকি একা। আরেকবার মনে পড়ে সেই রাস্তাটার কথাও। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না বলে একটা রিকশা ডেকে আবোল-তাবোল ঘুরি। ঘণ্টাখানেক পর রিকশা ছেড়ে দিয়ে এসে দাঁড়াই একটা পার্কের সামনে। হর্ন বাজিয়ে একেকটা বাস ট্রাক প্রাইভেট কার যেতে থাকে সামনে দিয়ে। যাত্রীদের কেউ কেউ তীব্র কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকি। কে যেন একটা ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটায়। দল বেঁধে কেউ যায়। বলে, ইশশশশ্?! আমি তবু দাঁড়িয়ে থাকি ঠায়। এ রকম একটা চেতন-অবচেতন অবস্থার মধ্যে একটা উদ্ভট ঘোরলাগা বিষণ্নতার ভেতরে খাবি খেতে খেতে আমার মাসের পর মাস কাটে। আমি নিজের ভেতরে নিজেই আরো ডুবে যেতে থাকি। একেকবার ভেসেও উঠি। মনে হয়, এই বেলা সব ভুলে ভালো থাকি। এ রকম করতে করতে এক সময় ভুলেও যাই। একা একা বাস করার আনন্দ আবিষ্কার করতে থাকি। নানাভাবে বুঝতে পারি, এই জগতে একা থাকার সুখ যে একবার টের পেয়েছে, সে আর ভুলেও দ্বৈত জীবনের পথ মাড়াতে চাইবে না। একা একা থাকি। আর ক্রমশ নিজেকে আরো বেশি বেশি ভালোবাসতে থাকি। মন খারাপ হলে নিজের কপালে নিজেই রাখি হাত। মনে মনে নিজেকে ভীষণ স্বাধীন আর সার্বভৌম লাগে। একা থাকার এই জীবনে তার সাথে আবারও জড়িয়ে যাই। তবু ভীষণ অস্থির লাগে। দিনের পর দিন রাতের পর রাত কথা বলা আর পাশে থাকার বিশেষ কোনো মানুষের অভাব অবচেতন মনের ভেতরে জ্বলতে থাকে বলে কেউ দু’দণ্ড কথা বললেই আমি খুব আগ্রহী হয়ে উঠি। কিন্তু সে তো শুধু কথা চায় না। সে চায় হাত ধরতে, পাশে বসতে, চুমু-টুমু খেতে। তিন রাত কথা বলেই তার শরীর আমাকে চায়। আমারও মনে থাকে না লোকটির বউ আছে, ফুটফুটে বাচ্চা আছে। আমি আবার নিজেকে ভালোবাসতে থাকি। তীব্র সেই ভালোবাসার দোলায় দুলতে দুলতে উইকএন্ডের আগের দিনের কোনো এক অলক্ষুণে সন্ধ্যায় সে যখন সেধে নিমন্ত্রণ নেয়, আমি চিকেন কারি রেঁধে সেজেগুজে তার অপেক্ষায় থাকি। এবং সেই রাতে লোকটিকে তীব্র করে কাছে পাবার মুহূর্তে আমি প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করি, কাউকে ভালোবাসবার মতো বোধ আমি হারিয়ে ফেলেছি। লোকটিকে অসহ্য বোধ হতে থাকে। কোনো রকমে চিকেন কারি খাইয়ে তাকে বিদায় জানাই। লোকটি অবাক। সে বউকে নানা মিথ্যা বলে আজ সারারাত আমার সঙ্গে থাকবে বলে এসেছিল।

সে বিদায় হলে আমি রান্নাঘরের কাবার্ড খুলে এটা সেটা খুঁজতে থাকি। কী যেন আমার খেতে ইচ্ছে করছে! কিন্তু কী সেটা, তা বুঝে উঠতে পারি না। সারারাত চকোলেট, বিস্কুট, আইসক্রিম, চানাভাজা এসব খাই। সাত-আটটা সিগারেট পুড়িয়ে শেষ করি। ভোররাতে দীর্ঘ সময় নিয়ে স্নান সেরে খুব যত্ন করে এক কাপ চা বানিয়ে মগভর্তি চা টেবিলে রেখে আমি বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমের ভেতরে নিজেকে খুব শান্ত একটা পাখির মতো মনে হয়। যেন কোনো এক গাছের মগডালে বসে আছি ছায়ার অপেক্ষায়। চারদিকে রোদ চমকাচ্ছে। এই রোদ নেমে গেলেই আমি ডানা মেলে উড়ে চলে যাব। রোদ পড়তেই আমি ডানা মেলে দিই। আর ধড়ফড় করে উঠে বসি। কারণ স্বপ্নের সেই পাখি জন্মের মুহূর্তেও আমার হঠাৎ মনে পড়ে যায়, আমি মানুষ আর এই মগডাল থেকে উড়বার উদ্দেশ্যে লাফ দিলেই আমি পড়ে যাব। আর লম্ফ দেবার মুহূর্তে খাট থেকে পড়ে যাবার অনুভূতি নিয়ে আমি জেগে উঠি। এ রকম প্রায়ই হয়।

বিকেল তখন মরা মরা। ঠিক স্বপ্নের রোদের মতো রোদ। একটা সাদা খোলের শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে আমি পথে বের হই। ছুটির দিনের নগর তখনও ঝিমুচ্ছে ভাত ঘুমে। একটা রিকশায় উঠে বসি। দূর থেকে আমার সেই রাস্তার বাঁকটা দেখে রিকশাওয়ালাকে বলি, থামেন, আমি পেঁৗছে গেছি। তারপর একটা সিগন্যাল পেরিয়ে বড় রাস্তা টপকে আমি যখন এসে দাঁড়াই সেই রাস্তার বুকের ওপরে, স্পষ্ট শুনতে পাই, সে শ্বাস ফেলে বলছে, বুকের ওপর খঞ্জ তুলে তুমি সীমারের মতো দাঁড়িয়ে আছ। আমি হিসহিসিয়ে বলি, জয় গোস্বামী। রাস্তা বলে, বেশ করেছো। আমি বলি, তোমার শরীর ভালো? রাস্তা বলে, হলুদ পাতারা সব ঢেকে দিয়েছে আমাকে। ভালো আছি। তুমি?

– আমার খুব ইচ্ছে করছে বাঁচি আর ভালোবাসি

– বাঁচলেই পারো, ভালোও তো বাসতে পারো

– কীভাবে বাঁচতে হয়, ভুলে গেছি আমি

রাস্তা ফোঁস কারে শ্বাস ফেলে। আমি একটা দুইটা হলুদ পাতা মাড়াই আর হাঁটি। কিছুটা আগাই আবার ফিরে আসি। পায়ের নিচে মরা পাতা মচমচ ধ্বনি তোলে। তাল ওঠে। কেমন এক নাচের মতো ছন্দ ওঠে। আমি ছন্দটা খুঁজতে থাকি মনে মনে। গুনগুন করে কলি ভাঁজতে থাকি। সেই কোন যুগে শৈশবে হারিয়ে যাওয়া এক গানের শব্দ আর সুর নিয়ে খেলতে থাকি। আমার বড় ভালো লাগে গানটা গাইতে। রাস্তা বলে, হাওয়া ওড়া পাতাঝরা দিনে নাচতে ইচ্ছে করে। তুমি ওই পাতার ঘুঙুর পরে এই বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাও। নাচো। আমি বলি, যাহ! তাই কি হয়! বলেই ঘুঙুর পরে ছুটে যাই দক্ষিণে। আবার ফিরে আসি। উত্তর দিকে একটা বাঁক নিয়ে শরীরটা পেঁচিয়ে আবার পশ্চিমে ফিরি। সারা শরীর ঘিরে নাচের নেশা চনমনিয়ে ওঠে। রাস্তা মায়াভরা মুগ্ধ চোখে আমাকে দেখে। আমি ক্লান্ত হয়ে বসি।

-রাস্তা… এই রাস্তা শুনছো?

-হুম্ম্

-আমি তোমাকে ভালোবাসি

-সত্যি?

-তিন সত্যি

আমি রাস্তার বুকের ওপরে ঝরেপড়া হলুদ পাতা সরিয়ে শুয়ে পড়ি। ওই পাশে বড় রাস্তায় তখন পৃথিবী জেগেছে ভাতঘুম সেরে। হর্ন-টর্ন বাজে, গাড়ির চাকা ঘষা খায় পিচে। আমি রাস্তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিই, তাকে চুমু খাই। বহুদিন পর বুঝতে পারি, আমি এখনও প্রেমের ভেতরে জীবন আর ভালোবাসার ভেতরে সমর্পণের জন্য বেঁচে আছি।