রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও কৃষি বিপ্লবের সমাজ ভাবনা

1694

এস.এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার:
সংসার থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বে তোমাদেরকে দেখার ইচ্ছা ছিল তা আজ পূর্ণ হল। তোমরা এগিয়ে চল জনসাধারণের জন্যে সবার আগে চাই শিক্ষা এডুকেশন ফাস্ট, সবাইকে শিক্ষা দিয়ে বাঁচাও। ইচ্ছা ছিল মান-সম্মান-সভ্রম সব ছেড়ে দিয়ে তোমাদের সঙ্গে তোমাদের মতোই সহজ হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেব। কী করে বাঁচতে হবে তোমাদের সঙ্গে মিলে সেই সাধনা করব, কিন্তু আমার আর এ বয়সে তা হবার নয়, এই নিয়ে দুঃখ করে কী করব? আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে তোমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখ। আমি তোমাদেরকে বড় ভালোবাসি, তোমাদের দেখলে আমার আনন্দ হয়, তোমাদের কাছে আমি অনেক কিছু পেয়েছি কিন্তু কিছুই তোমাদের দিতে পারিনি আশীর্বাদ করি তোমরা সুখী হও। তোমাদের সবার উন্নতি হোক এ কামনা নিয়ে পরলোকে চলে যাব।

১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই পতিসর তোথা পূর্ববাংলা থেকে শেষ বিদায় কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে প্রজাদের উদ্দেশ্য কথাগুলো বলেছিলেন যা, সাধারণ মানুয়ের প্রতি ভালোবাসা, মমত্ববোধেরই বহি:প্রকাশ। ‘১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারী নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারিদিকে ঘুরে ফিড়ে বেড়িয়েছেন, যেমন নাগর নদীতে ভেসে তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আসে পাশে হেঁটে। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে’ (এম মতিউর রহমান মামুন দৈনিক সমকাল ২৪ আগষ্ট ২০১৪)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ থেকে একশ বছর পূর্বে পতিসরে এসে বুঝতে পেরেছিলেন গ্রামের হতদরিদ্র, অসহায়, অশিক্ষিত মানুষকে শিক্ষিত করতে না পারলে আলোকিত ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে পতিসরে বিদায় ভাষণে হাজার জনতার মাঝে কবি দৃঢ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘সবার চেয়ে আগে চাই শিক্ষাথ এডুকেশন ফাস্ট, সবাইকে শিক্ষা দিয়ে বাঁচাও।’ সে কারণে কালীগ্রামে পরগনার পতিসরে (১৯০৫ সালে) হিতৈষী সভার উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন গ্রামে গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা, বিভাগের মধ্যে ইংরেজি ও কেন্দ্রে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, উপদেশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং শিলাইদহ ও কালীগ্রামে হাতে কলমে এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন’ (রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল পৃষ্ঠা ৩১২)। সে সময়ে ভারতে স্কুল কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা। গ্রামঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু বই পত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের নামে একটি গ্রন্থাগার করেছিলেন পতিসরে। পরে পতিসরে পুত্রের নামে প্রতিষ্ঠত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশনের ছাত্র- শিক্ষকদের উদ্দেশ্য আর্শিবাণীতে লিখলেন রথীন্দ্র নাথের নাম চিহ্নিত কালীগ্রামের এই বিদ্যালয়ের আমি উন্নতি কামনা করি। এখানে ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্বন্ধ যেন অকৃত্রিম স্নেহের এবং ধৈর্য্যের দ্বারা সত্য ও মধুর হয় এই আমার উপদেশ। শিক্ষাদান উপলক্ষে ছাত্রদিগকে শাসন পীড়নে অপমানিত করা অক্ষম ও কাপুরুষের কর্ম একথা সর্ব্বদা মনে রাখা উচিত। এরূপ শিক্ষাদান প্রণালী শিক্ষকদের পক্ষে আত্মসম্মানের হানিজনক। সাধারণতঃ আমাদের দেশে অল্পবয়স্ক বালকগণ প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকদের নির্মম শাসনের উপলক্ষ্য হইয়া থাকে একথা আমার জানা আছে। সেই কারণেই সতর্ক করিয়া দিলাম’। মূল লক্ষ্য ছিল যথাযথ শিক্ষাদানের মাধ্যমে গ্রামবাসীর মানসিক উন্নতি ঘটানো, সে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিশ্চয়তার বিধান। ঢাকার ছাত্র-জনতার উদ্দেশে এই সমাজ ভাবনার কথাই বলেছিলেন বেশকিছু কাল পর (১৯২৬ সালে )।

এবং মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠত্বের উৎকর্ষে শিক্ষা সকল মানুষের অধিকার। গ্রামে গ্রামে মানুষকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সকলের চেয়ে বড় দরকার শিক্ষার সাম্য’ (পল্লীপ্রকৃতি)। এক কথায় তার পূর্বাপর লক্ষ্য গ্রামবাসীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক উন্নয়ন এবং গ্রাম ও নগরের বৈষম্য হ্রাস করা, গ্রাম যেন শহরের উচ্ছিষ্টভোজী না হয় সে লক্ষ্যে নিজস্ব জমিদারির ২৩০ বর্গমাইল আয়তনের কালীগ্রাম পরগনার ৬০০টি গ্রামের সাধারণ মানুষের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে অবৈতনিক পাঠশালা চালু করেন। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য পতিসর, রাতোয়াল, কামতা, তিন বিভাগে তিনটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল স্থাপন করেন।

একথা সত্য যে, সীমিত পরিসরে রবীন্দ্রনাথের গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা পতিসরে সফল হয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল, গ্রামে গ্রামে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা, আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষির উন্নতি ও কুঠির শিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং বিকল্প বা উদ্বৃত্ত অর্থের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর গ্রাম গড়ে তোলা। কারণ তিনি দেখেছেন, ‘পল্লীবাসী আছে সুদূর মধ্যযুগে আর নগরবাসী বিংশ শতাব্দীতে’ (পল্লীপ্রকৃতি)। তাই পল্লী পুনর্গঠন ও স্বনির্ভর আধুনিক পল্লীসমাজ গঠনের মাধ্যমে বহু উচ্চারিত স্বরাজের ভিত তৈরি করা এবং এর জন্য দরকার জনসাধারণের যথার্থ শিক্ষাব্যবস্থা, যা তিনি কালীগ্রাম পতিসর থেকেই শুরু করে লিখেছিলেন। তোমরা যে পার এবং যেখানে পার এক- একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়ে আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যাবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যাবহার-সামগ্রী সন্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো।’ ( রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী ১০ম খন্ড পৃষ্ঠা ৫২০-৫২১) কালীগ্রাম পরগনার পল্লীগঠণের কাজে হাত দিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন কৃষকদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা। শোষিত বঞ্চিত কৃষকদের বাস্তব অবস্থা অবলোকন করে অপর এক চিঠিতে লিখলেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জ্বল আসে।ৃ বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক” (ছিন্নপত্র ১১১)।

রবীন্দ্রনাথ নিজ অন্তরের মাঝে আনমনে এঁকেছিলেন গরীব হতভাগ্য প্রজাদের ছবি ‘ অন্তরের মধ্যে আমিও যে এদেরই মতো দরিদ্র সুখদুঃখ কাতর মানুষ, পৃথিবীতে আমারও কত ছোট ছোট বিষয়ে দরবার, কত সামান্য কারণে মর্মান্তিক কান্না, কত লোকের প্রসন্নতার উপরে জীবনের নির্ভর! এই সমস্ত ছেলেপিলে-গোরুলাঙল-ঘরকান্না -ওয়ালা সরল হৃদয় চাষাভুষোরা আমাকে কী ভুলই জানে! আমাকে এদের সমজাতি মানুষ বলেই জানেনা। আমাকে এখানকার প্রজারা যদি ঠিক জানত, তাহলে আপনাদের একজন বলে চিনতে পারত’। (ছিন্নপত্রাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী ১৩৯৯ পৃষ্টা ৩৭)

রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন কৃষক সমাজ মহাজনদের কাছে তাঁরা ঋণী, এখান থেকে মুক্ত করতে না পারলে তাঁদের পক্ষে কোন কাজে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ অস্থির হয়ে উঠলেন কীভাবে ঋণগ্রস্থ গ্রামবাসীকে ঋণমুক্ত করার কার্যকারী সাহায্যের ব্যাবস্থা করা যায়। শেষ পর্যন্ত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় পরিজনের কাছে ধার দেনা করে পতিসর ব্যাংক খুললেন নাম ‘পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক’ উদ্দেশ্য স্বল্প সুদে প্রজাদের টাকা ধার দিয়ে মহাজনের গ্রাস থেকে তাঁদের মুক্ত করে অর্থবৃত্তে স্বাবলম্বী করা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘পতিসরে আমি কিছুকাল হইতে পল্লীসমাজ গড়িবার চেষ্টা করিতেছি যাহাতে দরিদ্র চাষী প্রজারা নিজেরা একত্র মিলিয়া দারিদ্র, অস্বাস্থ ও অজ্ঞান দূর করিতে পারে-প্রায় ৬০০ পল্লী লইয়া কাজ ফাঁদিয়াছি…..আমরা যে টাকা দিই ও প্রজারা যে টাকা উঠায়..এই টাকা ইহারা নিজে কমিটি করিয়া ব্যায় করে। ইহারা ইতিমধ্যে অনেক কাজ করিয়াছে’ (পল্লীপ্রকৃতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, ১৯৬২ পৃষ্ঠা ২৬১)। তাই গবেষকরা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের পল্লীসমাজ পরিকল্পনার সর্বত্তোম প্রকাশ যদি গণতান্ত্রিক গ্রামীণ পঞ্চায়েত ব্যাবস্থায় এবং এর অর্থনৈতিক ভিত্তি সর্বজনীন সমবায় ব্যাবস্থায় ঘটে থাকে, তাহলে সে সমবায় চিন্তার অসামান্য প্রকাশ ঘটেছে পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপনে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রামের শোষিত মানুষেরা ভয়াবহ মহাজনী ঋণের কবল থেকে মুক্তি পেল, কৃষক -কৃষির উন্নতি হলো, গ্রামের মানুষ শিক্ষার সুযোগ পেল স্বাস্থ সেবার উন্নয়ন হলো। রবীন্দ্রনাথের পল্লীউন্নয়ন ও পল্লীসমাজ গঠনের চেষ্টায় কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠি ছিল একটি অসাধারণ মাইলফলক (রবীন্দ্র ভূবনে পতিসর আহমদ রফিক)। শত বছর পরে আজ আমাদের দেশে গ্রামীণ মানুষের উন্নতির জন্য বে-সরকারী কিছু সংস্থা (এন,জি, ও) ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ পল্লীউন্নয়ন ও পল্লীগঠণের কাজে কি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার পরিচয় রেখেছিলেন পতিসরে। ব্রিটিশ বঙ্গে যখন সমবায় কার্যক্রম শুরু হয়নি; ‘ কোঅপারেটিভ ব্যাংক, লোন কম্পানি যখন ছিলোনা তখন পতিসরের মতো অখ্যাত পল্লীগ্রামে কৃষি ব্যাংক খুলে কৃষকদের ঋণমুক্ত হতে সহযোগিতা করা তা অসান্য কর্মদক্ষতারই উধাহরণ। সংগত কারণে ধরে নেওয়া যায় রবীন্দ্রানথ সাহিত্য সাধনার বাইরে পল্লী পূর্নগঠন কর্মকান্ডের যা কিছু সাফল্য তা পতিসরে এবং কৃষি সমবায় ব্যাংক ছিল তাঁর সর্বত্তোম প্রকাশ।

রবীন্দ্রনাথ নিজ জমিদারী পতিসরে পল্লীউন্নয়ন কাজটা শুরু করেছিলেন ১৯০৫ সালে। তাঁর ইচ্ছাছিল স্বল্প আয়ের অল্প শিক্ষিত সাধারণ মানুষের উন্নয়ন করা। কেননা গ্রামের সংখ্যাগোরিষ্ঠ মানুষকে পিছিয়ে রেখে, অশিক্ষত রেখে উন্নত সমাজ বা রাষ্ট্র গঠণ সম্ভব নয়। আর অর্থবৃত্তে সাবলম্বী হতে না পারলে শিক্ষার উন্নতীও অচিন্তনীয়। সেই লক্ষে পতিসরে স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, অধুনিক কৃষি ব্যাবস্থার পাশাপাশি গরীব প্রজাদের সহজ শর্তে ঋণ দানের জন্য কৃষি সমবায় ব্যাংক গঠণ করেছিলেন তা তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ব্যাংক চলেছিলো পঁচিশ বছর বাংলা১৩২০ থেকে ১৩৪৫সাল পর্যন্ত (সম্প্রতি উদ্ধার কৃত বরীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংকের লেজারের হিসাব অনুযায়ী) আর অমিতাভ চৌধুরী লিখেছেন, ‘ব্যাংক চলেছে কুড়ি বছর।’ প্রথমে ধারদেনা করে ১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, তাঁদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর। কত টকা ব্যাংকে মূলধোন ছিল তা নিয়েও মতোভেদ আছে কেউ বলছেন এক লক্ষ আট হাজার আবার অনেকে লিখেছেন এক লক্ষ আটাত্তোর হাজার টাকা’। (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃ. ৪৬২)। শুধু নবেল আর ধারদেনার টাকাই নয়, ব্যাংকের অবস্থা অস্থিতিশীল দেখে ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বইয়ের রিয়্যালটি এবং আমেরিকায় বক্তৃতা বাবদ প্রাপ্ত টাকা থেকে ন’হাজার টাকা জমা দেন। তবুও শেষ পর্যন্তু ব্যাংক আর টিকলোনা। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পিতৃস্মৃিতি’তে লিখেছেন ‘ ব্যাংক খোলার পর বহু গরীর প্রজা প্রথম সুযোগ পেল ঋণমুক্ত হওয়ার। কৃষি ব্যাংকের কাজ কিন্ত বন্ধ হয়ে গেলল যখন জঁৎধষ রহফবনঃবফহবংং -এর আইন প্রবর্তন হলো। প্রজাদের ধার দেওয়া টাকা আদায়ের উপায় রইল না’। ব্যাংকের শেষ অবস্থা নিরীক্ষণ করে ১৯১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে কবিগুরু প্রমথ চৌধুরীকে বার বার অনুরোধ করে লিখেছেন ‘দোহায় তোমার যত শ্রীঘ্র পার ব্যাংটাকে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে পরিণত করে নাও ( রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল খন্ড ৭ পৃষ্টা ২৯৭) কিন্তু কবির সে অনুরোধ শতর্কবাণী রাখা হয়নি, ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সকল স্বপ্ন শেষ করে দিয়ে। যাহোক মূল উদ্দেশ্য ছিলো মহাজনকে এলাকা ছাড়ানো। তাই ঘটেছিল মহাজনরা এলাকা ছাড়লো কৃষক ও কৃষির উন্নতি হল। আর কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ব্যাংকে মূলধোন বৃদ্ধি এ সব কর্মকান্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী সমাজ ভাবনার পূর্বাপর লক্ষ্য। তিনি পুত্র ও জামাতাকে কৃষিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে চিঠিতে লিখেছেন ‘তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্ন গ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাসের কিছু পরিমানে ও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলে মনে শান্তনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদেও শিক্ষার ব্যায়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের ঋণ সম্পর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সংসারিক উন্নতির চেয়ে ও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে’। (চিঠি পত্র ১৯ পৃ. ১১১) কালীগ্রামের এসব কর্মযজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ সম্পন্ন সফল হয়েছিলেন তা কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা থেকে অনুমান করা যায় “সেবার পতিসরে পৌঁছে গ্রাম বাসীদের অবস্থার অন্নতি দেখে মনপুলকিত হয়ে উঠলো। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছেনা। দেখলুম-নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছেলের দল স্কুলের ঘাটে। এমনকি, আট দশ মাইল দুরের গ্রাম খেকে ও ছাত্র আসছে। পড়াশুনার ব্যবস্থা প্রথম শ্রেনীর কোন ইস্কুলের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। পাঠশালা, মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। হাসপাতাল ও ডিসস্প্রেনছাড়ির কাজ ভালো চলছে। যেসব জোলা আগে এক সময গামছা বুনত তাঁরা এখন ধুতি, শাড়ী, বিছানার চাদর বুনতে পারছে। কুমোড়দের ও কাজের উন্নতি হয়েছে গ্রাম বাসির আর্থিক দুরবস্থা আর নেই। শুধু চাষীরা অণুযোগ জানালো তাদেরকে চাষের জন্য আরও ট্রাক্টর এনে দেওয়ার জন্য” (পিতৃস্মৃতি রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

রবীন্দ্রনাথ পতিসরের বাস্তব অবস্থা থেকেই অনুমান করেছিলেন শিক্ষা ব্যাতিত বিত্ত রক্ষা সম্ভব নয় তাই তিনি শিক্ষা বঞ্চিত অসহায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে, অর্থ বিত্তে স্বাবলম্বি করতে, তার নিজেস্ব জমিদারি পতিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। এসব কাজে পতিসরে সফল হয়ে পরে বোলপুরের লাল মাটিতে শান্তিনিকেতন গড়ে তুলে উনিশশো ষোল সালে আমেরিকার শিকাগো থেকে রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে বলেন, ‘শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে- ঐখানে সর্বজাতিক মনুষ্যত্ব চর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে- স্বজাতিক সংকীর্ণতার যুগ শেষ হয়ে আসছে- ভবিষ্যতের জন্য যে বিশ্বজাতিক মহামিলনযজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই হবে’। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পরে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার প্রেরনা রবীন্দ্রনাথ পতিসর থেকেই লাভ করেছেন।

লেখক:
পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ।
সম্পাদনা: এমআ/এসএইচটি