অনিরাপদ ও অবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠার আশঙ্কা

1129

এখন ডেস্ক

হত্যাকাণ্ডের শিকার সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতির সন্তানের নাম মাহির সারওয়ার মেঘ। গত রবিবার পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু দম্পতির ছেলের নামও মাহির (৭)। এদের দুজনের নামের মিলের পাশাপাশি জীবনে অনেক মিল হাজির হয়েছে। দুজনেই দেখেছে চোখের সামনে মায়ের রক্তাক্ত লাশ। দুজনকেই আতঙ্কিত চোখে মায়ের হত্যাকাণ্ড বর্ণনা করতে হয়েছে গণমাধ্যমে।

মিতুর সন্তান মাহিরের স্কুলের জুতায় মায়ের রক্ত লেগে আছে। সে মায়ের খুন হওয়ার ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছে আতঙ্কিত চোখে। এদিকে ২০১২ সালে সাংবাদিক সাগর রুনি দম্পতির ছেলে মেঘ দেখেছিল বাবা মায়ের রক্তে ভেজা শরীর। আতঙ্কিত মেঘ শুরুতে নানীকে খবর দেওয়া থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় স্বাভাবিক থাকলেও, দিন না যেতেই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠা মেঘ নির্ঘুম রাত কাটাতে শুরু করে। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শিশুরা সারাজীবন অনিরাপদ বোধ নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং অজানা ভয় তাদের অবিশ্বাসী করে তুলবে।

মিতুকে হত্যা করা হয়েছে সাত বছরের মাহিরের সামনে। সে বলেছে, ‘গুণ্ডারা আম্মুকে মারসে। ওরা হোন্ডা নিয়া ছিল তিনজন। তারপর একজন দৌড়ায়ে আমাদের দিকে আইসা আম্মুকে ফালাই দিয়ে চাকু ঢুকাই দিছে। আরেকজন গুলি মারসে।’ আতঙ্কিত চোখমুখে রবিবার সে এ কথাগুলো বলেছে।

এদিকে সাগর- রুনি দম্পতির ছেলে মাহির সারোয়ার মেঘকে সারাদিনই টেলিভিশনের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি বলে জানান তার মামা নওশের রোমান। তিনি বলেন, আমরা ‍শুরুর কয়েকদিন নিজেরাও বুঝিনি মেঘকে কীভাবে প্রটেকশন দেবো। এখনও অনেকে আগ্রহের বশত তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করে বসেন। এ কৌতূহলগুলো ছেলেটাকে আরও ভঙ্গুর করে ফেলে, এটা মানুষ বিবেচনায় রাখেন না। তিনি বলেন, এধরনের ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীরা যেভাবে শিশুটিকে প্রশ্ন করতে থাকে ‘কী দেখেছিলা’ সেটা একেবারেই অন্যায়। মেঘকে সামলে রাখার ক্ষেত্রে তাদের বিবেচনায় কোন বিষয়গুলো থাকে জানতে চাইলে তিনি বলেন,সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকে সঙ্গ দিয়ে রাখা। আর কেউ যেন তাকে বাবা মায়ের বিষয়গুলো নিয়ে না খোঁচায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। তিনি বলেন, বাবুল আক্তারের ছেলের নাম মাহির আমাদের মেঘের নামও মাহির, আমরা সারাদিন আতঙ্কিত ছিলাম মেঘ কোনওভাবে জানলে সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তবে ও গতকাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার কারণে সারাদিনই এসবের বাইরে ছিল।

সমাজ বিশ্লেষক ও মনোচিকিৎসকরা মনে করেন, আমাদের দেশে শিশুদের মনস্তত্ব এবং এ পরিস্থিতিতে তাদের প্রতি বড়দের আচরণ নিয়ে কার্যকর কোনও গবেষণা বা কাজ নেই বললেই চলে। উন্নয়নকর্মী গীতা অধিকারী বলেন, মেঘরা সারাজীবন একটা ট্রমা নিয়ে বেড়ে উঠবে। মানুষের জীবন এত মূল্যহীন! প্রকাশ্যে খুনীরা খুন করে চলে যাচ্ছেন, মানুষ সব কোথায় ছিল?  যে ছেলে তার চোখের সামনে মা-কে খুন হতে দেখলো, সে মানুষকে আর বিশ্বাস করবে কী করে? স্বাভাবিক জীবন যাপন করা ওদের জন্য কঠিন।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সরকারকেই প্রমাণ করতে হবে দেশে আইনের শাসন আছে। তারা সেটি প্রমাণে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছে। আজ এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার পরিবার কিংবা দোকানদার কেউই নিরাপদ নন। কেবল জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কথা বলে শুরুতেই বিষয়টাকে ঘোলা করে ফেলা হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা দরকার।

তিনি আরও বলেন, এধরনের শিশুদের মধ্যে অনিরাপদবোধ খুব বেশি হয়। এক ধরনের ভয় সারাক্ষণ কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে। শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমাদের দেশে খুব কম কাজ হচ্ছে, তেমন গুরুত্বই পায় না। মেঘ বা বাবুলের ছেলে এই সমাজের প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হবে তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

মনোচিকিৎসক মোহাম্মদ আসিফ মনে করেন, এধরনের ক্ষেত্রে শিশুটিকে এই ঘটনা থেকে বের করতে পারিবারিক সহায়তা যেমন দরকার, তেমন প্রফেসনাল কাউন্সিলিং দরকার। এবং কোনওভাবেই এ হত্যাকাণ্ড তদন্তে তার জবানবন্দি সরাসরি নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ সেটা তাকে আবারও সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে। বরং দক্ষ কাউন্সিলরের মাধ্যমে এই জবানবন্দির কাজটা করলে সে বিষয়টা বলে ফেলার সময় টেরও পাবে না। ভবিষ্যতে কী ধরনের চাপ নিয়ে এ ধরনের শিশু বেড়ে ওঠে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার মাথা থেকে ইমেজগুলো সরে যাওয়া কঠিন। এখন থেকেই তার চারপাশের মানুষদের সতর্ক আচরণ করার কথা ভাবতে হবে। সে যেন প্রতিশোধ পরায়ণ চিন্তার মধ্যে না ঢোকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

উদিসা ইসলাম

সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন